কিডনি ভালো রাখার ঘরোয়া উপায়: সহজ এবং কার্যকর টিপস
আপনি কি জানেন, কিডনি আমাদের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা রক্ত পরিশোধন করে এবং শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বের করে দেয়? তাই আপনার কিডনির যত্ন নেওয়া একদমই জরুরি। কিন্তু কিডনি সুস্থ রাখতে জটিল ও ব্যয়বহুল চিকিৎসার দরকার নেই। ঘরোয়া কিছু সহজ উপায়েই আপনি আপনার কিডনিকে ভালো রাখতে পারেন।
এই লেখায় আমরা এমনই কিছু কার্যকর এবং প্রমাণিত ঘরোয়া উপায় সম্পর্কে জানাবো, যা আপনার কিডনিকে সুস্থ ও শক্তিশালী রাখবে। তাহলে, চলুন শুরু করা যাক এবং আপনার কিডনির সুস্থতার জন্য দরকারি টিপসগুলো বিস্তারিত জানুন।
কিডনির জন্য উপকারী খাবার
কিডনির সঠিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে খাদ্যের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিডনির জন্য উপকারী খাবার নিয়মিত খেলে কিডনি সুস্থ থাকে। এগুলো শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ দূর করতে সাহায্য করে।
সঠিক খাদ্যাভ্যাস কিডনির ওজন কমায় এবং দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা থেকে রক্ষা করে। তাই ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, প্রোটিন ও অন্যান্য উপাদান নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ।
ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম নিয়ন্ত্রণ
অতিরিক্ত ফসফরাস কিডনির উপর চাপ বাড়ায়। তাই ফসফরাসযুক্ত খাবার সীমিত করা উচিত।
দুধ, পনির, বাদাম ও প্রক্রিয়াজাত খাবারে ফসফরাস বেশি থাকে। এই খাবার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
ক্যালসিয়াম গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে যেন কিডনিতে পাথর না হয়।
তাজা সবজি ও ফলমূলের গুরুত্ব
তাজা সবজি ও ফলমূল ভিটামিন ও খনিজে সমৃদ্ধ। এগুলো কিডনিকে শক্তিশালী করে।
প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও ফল খাওয়া উচিত।
কম লবণ ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবারসহ ফলমূল কিডনি সুস্থ রাখে।
প্রোটিন ও দুগ্ধজাত খাবারের পরিমাণ
অতিরিক্ত প্রোটিন কিডনির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তাই প্রোটিন সঠিক পরিমাণে গ্রহণ জরুরি।
মাছ, মাংস ও ডাল থেকে প্রোটিন নিন, তবে মাত্রা বজায় রাখুন।
দুগ্ধজাত খাবার নিয়মিত কম পরিমাণে খেলে কিডনির সুস্থতা বজায় থাকে।

Credit: www.carehospitals.com
কিডনির সমস্যা ও লক্ষণ
কিডনি আমাদের শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। এটি শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত পানি বের করে দেয়। কিডনির সমস্যা শুরু হলে শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও প্রভাব পড়ে। তাই কিডনির সমস্যা ও লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
অনেক সময় কিডনির সমস্যা শুরুতে সহজে বুঝা যায় না। কিন্তু কিছু বিশেষ লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া উচিত। সমস্যা দ্রুত সনাক্ত করলে চিকিৎসা সহজ হয় এবং জটিলতা এড়ানো যায়।
কিডনি সংক্রমণের প্রধান চিহ্ন
কিডনি সংক্রমণ হলে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। পিঠ বা কোমরের এক পাশে ব্যথা থাকতে পারে। শরীর জ্বরে আক্রান্ত হতে পারে। প্রস্রাবে রক্ত বা পুঁজ দেখা দেয়। প্রস্রাব করার সময় জ্বালা বা পুড়নির সমস্যা হতে পারে। শরীর দুর্বল ও ক্ষুধামন্দা অনুভূত হয়। বমি বমি ভাব বা পেট খারাপ হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।
ব্যথা ও প্রস্রাবের পরিবর্তন
কিডনির অসুস্থতায় প্রস্রাবের রঙ ও গন্ধ পরিবর্তিত হয়। প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যেতে পারে। আবার অনেক সময় বেশি প্রস্রাব হতে পারে। প্রস্রাবের সময় ব্যথা বা জ্বালা অনুভব হলে তা কিডনির সমস্যার সংকেত। পায়ে ফোলা বা শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্ফীতি দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণ চোখ এড়ালে বড় সমস্যা হতে পারে।
সুস্থ কিডনির জন্য জীবনযাপন
কিডনির সুস্থতা বজায় রাখতে জীবনযাত্রার নিয়মিত পরিচর্যা অপরিহার্য। শরীরের বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত তরল বের করতে কিডনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সুস্থ কিডনি পেতে শারীরিক ও মানসিক যত্ন নিতে হবে। প্রতিদিনের অভ্যাস কিডনির স্বাস্থ্যের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
সুস্থ কিডনির জন্য জীবনযাপন মানে হলো সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ। এছাড়া রক্তচাপ ও রক্তের শর্করার নিয়ন্ত্রণ কিডনি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। পরিমিত জলপান ও হাইড্রেশন নিশ্চিত করা কিডনির স্বাভাবিক কাজকর্ম বজায় রাখে।
নিয়মিত ব্যায়ামের প্রভাব
নিয়মিত ব্যায়াম কিডনির রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে। এটি শরীরের অতিরিক্ত টক্সিন বের করে দিতে সাহায্য করে। ব্যায়াম ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, যা কিডনির উপর চাপ কমায়। শারীরিক সক্রিয়তা রক্তচাপ কমায়, যা কিডনির জন্য ভালো। সপ্তাহে অন্তত তিন থেকে চার দিন ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম উপকারী।
রক্তচাপ ও শর্করা নিয়ন্ত্রণ
উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস কিডনি রোগের প্রধান কারণ। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা কিডনির ক্ষয় রোধ করে। নিয়মিত রক্তচাপ মাপা উচিত। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ডায়েট ও ওষুধ অনুসরণ জরুরি। চিনির মাত্রা কমানো ও সুষম খাদ্য গ্রহণ কিডনি রক্ষায় সহায়ক।
তরল পান ও হাইড্রেশন
পর্যাপ্ত জলপান কিডনি পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। দিনে কমপক্ষে ৮ গ্লাস পানি পান করা উচিত। জল শরীর থেকে টক্সিন বের করে দেয়। হাইড্রেটেড থাকা প্রস্রাবকে স্বাভাবিক রাখে ও সংক্রমণ কমায়। চিনি ও ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় পরিহার করা ভালো।
কিডনির যত্নে ঘরোয়া টিপস
কিডনির সুস্থতা বজায় রাখা জীবনের জন্য খুবই জরুরি। নিয়মিত কিছু ঘরোয়া অভ্যাস কিডনির যত্ন নিতে সাহায্য করে। এই টিপসগুলি সহজ এবং প্রতিদিন মেনে চলা যায়।
কিডনি ভালো রাখতে সতর্ক হওয়া দরকার। স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রায় এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পর্যাপ্ত পানি পান করা
প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করা কিডনির জন্য খুব ভালো। পানি শরীর থেকে টক্সিন বের করে দেয়। এতে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমে।
প্রতিদিন অন্তত ৮ গ্লাস পানি পান করার চেষ্টা করুন। শরীর হাইড্রেটেড থাকলে কিডনি ভালো কাজ করে।
লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো
লবণ বেশি খেলে কিডনির ওপর চাপ পড়ে। প্রক্রিয়াজাত খাবারে লবণ ও কেমিক্যাল থাকে বেশি।
তাই লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া উচিত। বাড়িতে রান্না করা খাবারে লবণ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ।
অতিরিক্ত ওষুধ ও ধূমপান এড়ানো
অতিরিক্ত ওষুধ কিডনির ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে ব্যথানাশক ওষুধ বেশি খাওয়া ক্ষতিকর।
ধূমপান কিডনির রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত করে। ধূমপান না করলে কিডনি সুস্থ থাকে।
রসুনের উপকারিতা
রসুন প্রাচীনকাল থেকে ঔষধি গুণে সমৃদ্ধ একটি খাবার। এটি কিডনিসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের স্বাস্থ্য রক্ষা করে। রসুনের নিয়মিত ব্যবহার কিডনির কার্যক্ষমতা উন্নত করে। পাশাপাশি শরীরকে অনেক রোগ থেকে মুক্ত রাখে।
রসুনের মধ্যে প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহ নাশক উপাদান থাকে। এগুলো কিডনিকে সুরক্ষা দেয় এবং ফাংশন ঠিক রাখে। নিচে রসুনের প্রধান দুইটি উপকারিতা আলোচনা করা হলো।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে রসুন
রসুনে অ্যালিসিন নামক একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এটি শরীরের ক্ষতিকর মুক্ত মৌল দমন করে। ফলে কিডনির কোষগুলো সুরক্ষিত থাকে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রসুন কিডনির প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
প্রদাহ কমলে কিডনি ভালো কাজ করে। এটি কিডনি রোগ প্রতিরোধে সহায়ক। নিয়মিত রসুন খেলে কিডনি সুস্থ থাকে এবং বর্জ্য পদার্থ দ্রুত বের হয়।
কোলেস্টেরল কমানো ও প্রদাহ হ্রাস
রসুন রক্তের কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। কম কোলেস্টেরল হলে রক্তপ্রবাহ উন্নত হয়। কিডনিতে রক্ত সঠিকভাবে পৌঁছায়। এতে কিডনির ফাংশন ভালো থাকে।
রসুনের প্রদাহবিরোধী গুণ কিডনির সংক্রমণ ও জটিলতা কমায়। এটি কিডনি সম্পর্কিত নানা রোগের ঝুঁকি হ্রাস করে। রসুন খেলে শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে।
Credit: play.google.com
কিডনি রক্ষায় খাদ্যাভ্যাস
কিডনি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি রক্ত পরিষ্কার করে, বর্জ্য পদার্থ দূর করে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস কিডনি সুস্থ রাখে। খাদ্যের মাধ্যমে কিডনির ওপর চাপ কমানো সম্ভব। তাই কিডনি রক্ষায় খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপুর্ণ।
সুষম খাদ্যের গুরুত্ব
সুষম খাদ্য কিডনির স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। এতে থাকে পর্যাপ্ত পরিমাণ শাকসবজি, ফল, গোটা শস্য। চর্বিহীন প্রোটিন যেমন মাছ, মুরগি, ডাল থাকা উচিত। স্বাস্থ্যকর চর্বি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। তাজা ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। এতে কিডনি ভালো কাজ করে। শরীরের বিষাক্ত পদার্থ দ্রুত বের হয়ে যায়।
কী খাবার থেকে দূরে থাকা উচিত
অতিরিক্ত লবণ খাওয়া কিডনির জন্য ক্ষতিকর। লবণ কম খেলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। প্রক্রিয়াজাত খাবার যেমন প্যাকেটজাত খাবার, ফাস্টফুড এড়াতে হবে। অতিরিক্ত চিনি কিডনিতে চাপ বৃদ্ধি করে। ফসফরাস ও পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার সীমিত করা উচিত। যেমন অতিরিক্ত দুধ, পনির, কলা। মাংস বেশি খেলে কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। অতিরিক্ত অ্যালকোহল এবং সোডা পান করা উচিত নয়।

Credit: www.youtube.com
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQs)
কি কি খাবার খেলে কিডনি ভালো থাকে?
কিডনি ভালো রাখতে বেশি করে তাজা ফল, শাকসবজি, কম ফসফরাস ও ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার খান। লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে দিন। পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং হালকা প্রোটিন গ্রহণ করুন। হাঁস-মুরগি ও মাছ সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।
কিডনি ইনফেকশন হলে কি কি লক্ষণ দেখা যায়?
কিডনি ইনফেকশনে প্রস্রাবে ব্যথা, রক্ত বা পুঁজ দেখা যায়। পেট বা পিঠে ব্যথা, জ্বর, ঠান্ডা লাগা, ঘন ঘন প্রস্রাব, বমি বমি ভাব, দুর্বলতা হতে পারে।
লিভার এবং কিডনি ভালো রাখার উপায় কী কী?
লিভার ও কিডনি সুস্থ রাখতে প্রচুর পানি পান করুন, স্বাস্থ্যকর খাদ্য খান, ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন। নিয়মিত ব্যায়াম ও রক্তচাপ-শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখুন। ব্যথানাশক ওষুধ অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।
কিডনি রোগী কি কাঁচা রসুন খেতে পারবে?
কাঁচা রসুন কিডনি রোগীদের জন্য পরিমিত মাত্রায় খাওয়া যেতে পারে। এটি কিডনির প্রদাহ কমায় ও রক্তশোধনে সাহায্য করে। তবে অতিরিক্ত রসুন এড়ানো উচিত এবং ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কিডনি ভালো রাখার জন্য কোন খাবার বেছে নেব?
তাজা ফল এবং সবজি কিডনির জন্য ভালো। লবণ ও ফসফরাস কম খাবেন। প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়ানো উচিত।
উপসংহার
কিডনি ভালো রাখার জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্যকর অভ্যাস জরুরি। পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং তাজা ফল ও সবজি খান। লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে দিন। শারীরিক ব্যায়াম করুন এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। রক্তচাপ ও শর্করার মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করুন। ধূমপান ও অতিরিক্ত ওষুধ থেকে বিরত থাকুন। ছোট ছোট পরিবর্তনেই কিডনি সুস্থ রাখা সম্ভব। যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন।
