নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়ার চিকিৎসা
আপনার কি মনে হয় আগের মতো আর শারীরিক সম্পর্কের প্রতি আগ্রহ পাচ্ছেন না? আপনি কি নিজের মধ্যে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন? আপনি একা নন। অনেক নারীর জীবনেই এমন সময় আসে।
নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়ার লক্ষণগুলো বোঝা খুব জরুরি। এটি আপনার শরীরের একটি সংকেত হতে পারে। হতে পারে আপনার মন বা শরীর আপনাকে কিছু বলতে চাইছে।
আজ আমরা এই বিষয়টি নিয়ে সহজভাবে কথা বলব। কোনো জটিল শব্দ নয়, বরং একদম সহজ ভাষায় আমরা জানব কেন এমন হয়।
নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়ার লক্ষণ আসলে কী?
যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া মানে শুধু শারীরিক সম্পর্কের ইচ্ছা না থাকা নয়। এর আরও অনেক গভীর দিক আছে। সহজ কথায়, যখন আপনার শরীর বা মন মিলনের জন্য আর আগের মতো সাড়া দেয় না, তখনই একে আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া বলা হয়।
নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়ার লক্ষণ গুলোর মধ্যে প্রধান হলো কোনো ধরনের যৌন চিন্তার অভাব। আপনার মনে হয়তো আর আগের মতো রোমান্টিক চিন্তা আসে না। সঙ্গীর সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার কথা ভাবলে আপনি হয়তো কিছুটা অস্বস্তি বোধ করেন।
এটি হুট করে হতে পারে। আবার অনেক দিন ধরে ধীরে ধীরেও হতে পারে। আপনার যদি মনে হয় আপনার স্বাভাবিক ইচ্ছাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, তবে সেটিই বড় লক্ষণ।
১. মিলনের প্রতি অনীহা বা অনাগ্রহ
সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো মিলনের প্রতি কোনো আগ্রহ না থাকা। আগে হয়তো আপনি নিজেই উদ্যোগ নিতেন। কিন্তু এখন সঙ্গী কাছে এলেও আপনি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
আপনি হয়তো নানা অজুহাত খুঁজছেন। যেমন- "আজ খুব ক্লান্ত লাগছে" বা "কাল কাজ আছে"। অবশ্যই ক্লান্তি একটি কারণ হতে পারে। কিন্তু যদি দিনের পর দিন এমন হয়, তবে বুঝতে হবে আপনার যৌন আকাঙ্ক্ষা কমছে।
এটি কোনো অপরাধ নয়। আপনার শরীর হয়তো কোনো কারণে বিশ্রাম চাইছে। অথবা আপনার মনে কোনো দুশ্চিন্তা কাজ করছে। এই অনাগ্রহকে অবহেলা করবেন না।
২. যৌন কল্পনা বা ফ্যান্টাসি কমে যাওয়া
আমাদের মনের ভেতর মাঝেমধ্যে রোমান্টিক বা যৌন চিন্তা আসে। একে আমরা কল্পনা বা ফ্যান্টাসি বলি। এটি সুস্থ মনের একটি লক্ষণ।
কিন্তু যদি দেখেন আপনার মাথায় আর এমন কোনো চিন্তা আসছে না, তবে সেটি একটি সংকেত। আগে হয়তো কোনো মুভি দেখলে বা গল্প পড়লে আপনার মনে ইচ্ছা জাগত। এখন আর তেমন কিছু অনুভব করেন না।
আপনার মন যদি পুরোপুরি এসব থেকে দূরে সরে যায়, তবে এটি নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়ার লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। আপনার মস্তিষ্ক যখন এই সংকেত দেওয়া বন্ধ করে দেয়, তখন বুঝতে হবে কোথাও কোনো সমস্যা হচ্ছে।
৩. মিলনের সময় আনন্দ না পাওয়া
মাঝে মাঝে আপনি হয়তো সঙ্গীর অনুরোধে মিলনে রাজি হন। কিন্তু আপনি কি আগের মতো আনন্দ পাচ্ছেন? যদি দেখেন মিলনের পুরো সময়টা আপনার কাছে বিরক্তিকর বা যান্ত্রিক মনে হচ্ছে, তবে এটি চিন্তার বিষয়।
শারীরিক সম্পর্কে আনন্দ পাওয়া একটি স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু আকাঙ্ক্ষা কমে গেলে শরীর আর আগের মতো সাড়া দেয় না। ফলে আপনি কোনো সুখ অনুভব করেন না।
এমনকি অনেক সময় এটি আপনার কাছে একটি 'কাজ' বা 'দায়িত্ব' মনে হতে পারে। যখন ভালোবাসা বা আনন্দ হারিয়ে যায়, তখন আকাঙ্ক্ষাও কমতে শুরু করে।
৪. শারীরিক অস্বস্তি বা ব্যথা অনুভব করা
অনেক নারী মিলনের সময় ব্যথা অনুভব করেন। এটিও যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ এবং লক্ষণ। যখন শরীরে পর্যাপ্ত উত্তেজনা তৈরি হয় না, তখন মিলন কষ্টদায়ক হতে পারে।
এই ব্যথার কারণে অবচেতনভাবেই আপনার মন মিলন থেকে দূরে থাকতে চায়। আপনার শরীর মনে রাখে যে গতবার ব্যথা হয়েছিল। তাই এবার আর সে আগ্রহ দেখায় না।
হরমোনের পরিবর্তন বা যোনিপথের শুষ্কতা এর কারণ হতে পারে। আপনার যদি মিলনের সময় অস্বস্তি হয়, তবে লজ্জা না পেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৫. হরমোনের পরিবর্তন এবং এর প্রভাব
নারীদের শরীরের হরমোন অনেক সময় ওঠানামা করে। বিশেষ করে মাসিকের আগে-পরে, গর্ভাবস্থায় বা সন্তান জন্মের পর। এই হরমোনের পরিবর্তনের কারণে আপনার ইচ্ছা কমে যেতে পারে।
ইস্ট্রোজেন হরমোন কমে গেলে যোনিপথের চামড়া পাতলা হয়ে যায়। এতে মিলনের ইচ্ছা কমে যায়। আবার মেনোপজ বা ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ার সময়ও এমন হয়।
এটি আপনার হাতে নেই। এটি একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তবে এই পরিবর্তনের লক্ষণগুলো চিনতে পারলে আপনি সঠিক চিকিৎসা নিতে পারবেন।
৬. অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা স্ট্রেস
আজকাল আমাদের জীবন অনেক ব্যস্ত। অফিসের কাজ, ঘরের কাজ, বাচ্চার পড়াশোনা—সব মিলিয়ে আপনি হয়তো খুব চাপে থাকেন। এই অতিরিক্ত মানসিক চাপ আপনার যৌন জীবনের বড় শত্রু।
যখন আপনার মস্তিষ্ক সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকে, তখন সে রোমান্টিক চিন্তা করার সময় পায় না। আপনার শরীর তখন 'সারভাইভাল মোড'-এ চলে যায়। অর্থাৎ শরীর শুধু টিকে থাকার চেষ্টা করে, আনন্দের কথা ভাবে না।
দীর্ঘদিন ধরে স্ট্রেস বা বিষণ্ণতায় থাকলে যৌন আকাঙ্ক্ষা তলানিতে গিয়ে ঠেকতে পারে। এটিও নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়ার লক্ষণ।
৭. আত্মবিশ্বাসের অভাব বা শরীরের প্রতি নেতিবাচক ধারণা
আপনি কি নিজের শরীর নিয়ে খুশি? অনেক সময় ওজন বেড়ে যাওয়া বা বয়সের কারণে নারীরা হীনম্মন্যতায় ভোগেন। আপনার যদি মনে হয় আপনি আর আগের মতো আকর্ষণীয় নন, তবে আপনার ইচ্ছা কমে যাবে।
আপনি যখন সঙ্গীর সামনে যেতে দ্বিধা বোধ করেন, তখন আকাঙ্ক্ষাও কমতে থাকে। নিজের প্রতি এই নেতিবাচক ধারণা আপনার যৌন জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
মনে রাখবেন, ভালোবাসা শরীরের গঠনের ওপর নির্ভর করে না। কিন্তু আপনার মনের ভেতর যদি এই ভয় থাকে, তবে সেটি কামনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
৮. সম্পর্কের টানাপোড়েন বা ঝগড়া
শারীরিক সম্পর্ক শুধু শরীরের বিষয় নয়, এটি মনেরও বিষয়। আপনার সঙ্গীর সাথে যদি আপনার সম্পর্ক ভালো না থাকে, তবে তার সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার ইচ্ছা থাকবে না।
সারাদিন ঝগড়া বা মনোমালিন্য হলে রাতে তার কাছে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যদি আপনার মনে সঙ্গীর প্রতি রাগ বা ক্ষোভ জমে থাকে, তবে আপনার শরীর তাকে সাড়া দেবে না।
আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়ার এটি একটি মানসিক লক্ষণ। সম্পর্কের দূরত্ব ঘুচাতে না পারলে এই সমস্যা সমাধান করা কঠিন হয়।
৯. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
আপনি কি নিয়মিত কোনো ওষুধ খাচ্ছেন? কিছু ওষুধ আছে যা যৌন আকাঙ্ক্ষা কমিয়ে দেয়। যেমন- উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ, বিষণ্ণতা কমানোর ওষুধ বা জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল।
এই ওষুধগুলো শরীরের ভেতরের রাসায়নিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আনে। ফলে আপনার ইচ্ছা কমে যেতে পারে। যদি দেখেন নতুন কোনো ওষুধ শুরু করার পর থেকে আপনার এই সমস্যা হচ্ছে, তবে আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।
ওষুধ বন্ধ করবেন না, বরং বিকল্প কোনো উপায় আছে কি না তা জেনে নিন। এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ যা অনেকে খেয়াল করেন না।
১০. পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং ক্লান্তি
সারাদিনের খাটুনির পর আপনি যখন বিছানায় যান, তখন আপনার শরীর শুধু ঘুম চায়। যদি আপনি প্রতিদিন পর্যাপ্ত না ঘুমান, তবে আপনার শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়বে।
ক্লান্ত শরীরে কামনার কোনো জায়গা থাকে না। ঘুমের অভাবে শরীরের হরমোন ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে আপনার যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যায়।
যৌন শক্তি এবং ইচ্ছার জন্য শরীরের বিশ্রাম খুব প্রয়োজন। যদি আপনি সারাক্ষণ ক্লান্ত অনুভব করেন, তবে সেটি আপনার যৌন জীবনের ওপর প্রভাব ফেলবে।
১১. জীবনযাত্রার ধরন এবং খাদ্যাভ্যাস
আপনি কী খাচ্ছেন এবং আপনার দিনকাল কেমন কাটছে, তার ওপর যৌন জীবন নির্ভর করে। অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার বা ব্যায়াম না করার ফলে শরীরে অলসতা আসে।
আবার ধূমপান বা মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে রক্ত সঞ্চালন কমে যায়। এতে জননাঙ্গে রক্ত ঠিকমতো পৌঁছাতে পারে না। ফলে আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দেয়।
সুস্থ জীবনধারা শুধু শরীরের জন্য নয়, আপনার সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্যও জরুরি। অলস জীবনযাপন এই আকাঙ্ক্ষা কমিয়ে দিতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
আপনার যদি মনে হয় এই সমস্যা আপনার জীবনের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে, তবে দেরি করবেন না। এটি কোনো লজ্জার বিষয় নয়। একজন গাইনিকোলজিস্ট বা সেক্সোলজিস্ট আপনাকে সাহায্য করতে পারেন।
যদি দেখেন আপনার সঙ্গীর সাথে সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে বা আপনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন, তবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। রক্ত পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে হরমোনের কোনো ঘাটতি আছে কি না।
সময়মতো চিকিৎসা নিলে এবং মন খুলে কথা বললে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আপনার সুস্থতা এবং সুখ আপনার হাতেই।
উপসংহার
নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়ার লক্ষণ গুলো মূলত একটি সংকেত। আপনার শরীর আপনাকে বলছে যে কোথাও কোনো যত্নের অভাব আছে। হতে পারে সেটি মানসিক, শারীরিক বা সম্পর্কের কোনো বিষয়। নিজের ওপর রাগ করবেন না বা নিজেকে দোষী ভাববেন না।
সবচেয়ে বড় সমাধান হলো কথা বলা। আপনার সঙ্গীর সাথে আপনার মনের অবস্থা শেয়ার করুন। একসাথে সময় কাটান এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের সাহায্য নিন। মনে রাখবেন, যৌন জীবন আপনার সুস্থতারই একটি অংশ। এটি ফিরে পাওয়া সম্ভব।
সাধারণ কিছু প্রশ্ন (FAQs)
১. যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া কি কোনো রোগ?
না, এটি কোনো রোগ নয়। এটি অনেক সময় শরীরের বিভিন্ন পরিবর্তনের ফল। তবে দীর্ঘ সময় এমন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
২. বয়স বাড়লে কি ইচ্ছা কমে যায়?
বয়স বাড়লে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে ইচ্ছা কিছুটা কমতে পারে। তবে এটি সবার ক্ষেত্রে এক নয়। সঠিক জীবনযাত্রার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় সুস্থ থাকা সম্ভব।
৩. খাবারের মাধ্যমে কি এই সমস্যা মেটানো যায়?
হ্যাঁ, পুষ্টিকর খাবার যেমন ফলমূল, শাকসবজি এবং বাদাম শরীরে শক্তি যোগায় এবং হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখে।
৪. দুশ্চিন্তা কমলে কি ইচ্ছা ফিরে আসে?
অবশ্যই। মন ফুরফুরে থাকলে এবং দুশ্চিন্তা কম হলে শরীরের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষাগুলো আবার ফিরে আসতে শুরু করে।
৫. সঙ্গীর সাথে কথা বলা কতটা জরুরি?
এটি সবচেয়ে বেশি জরুরি। সঙ্গী যদি আপনার অবস্থা বুঝতে পারেন, তবে আপনার ওপর চাপ কমবে এবং আপনারা দুজনে মিলে সমাধান খুঁজতে পারবেন।
Permalink: /nari-sex-drive-low-symptoms-guide/
Meta Description: