হাতের নখের চারপাশে চামড়া উঠার কারণ
আমাদের অনেকেরই একটি কমন সমস্যা হলো নখের পাশের চামড়া উঠে যাওয়া। এটি দেখতে যেমন খারাপ লাগে, তেমনি মাঝে মাঝে বেশ যন্ত্রণাদায়কও হয়। আপনি হয়তো খেয়াল করেছেন, হঠাৎ করেই নখের কোণ দিয়ে পাতলা চামড়া উঠতে শুরু করেছে। কখনো সেখানে ব্যথা হয়, আবার কখনো রক্তও বের হয়।
অনেকেই ভাবেন এটি হয়তো সাধারণ কোনো বিষয়। কিন্তু আসলে হাতের নখের চারপাশে চামড়া উঠার কারণ অনেকগুলো হতে পারে। এটি আপনার শরীরের ভেতরের কোনো সমস্যার লক্ষণও হতে পারে। আবার আপনার দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসের কারণেও এমনটা হতে পারে।
আজকের এই লেখায় আমরা খুব সহজভাবে জানবো কেন এমন হয়। এবং এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়গুলো নিয়েও কথা বলবো। চলুন তবে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
হাতের নখের চারপাশে চামড়া উঠার কারণ কী?
হাতের নখের চারপাশের চামড়া খুব পাতলা এবং সংবেদনশীল হয়। এখানে তেলের গ্রন্থি খুব কম থাকে। তাই এই অংশটি খুব দ্রুত শুকিয়ে যায়। যখন চামড়া অতিরিক্ত শুকিয়ে যায়, তখন তা ফাটতে শুরু করে এবং উঠে আসে।
মূলত আর্দ্রতার অভাবই এর প্রধান কারণ। তবে শুধু আবহাওয়া নয়, আমাদের জীবনযাত্রার অনেক কিছু এর পেছনে কাজ করে। আপনি যদি নিয়মিত হাতের যত্ন না নেন, তবে এই সমস্যা বারবার ফিরে আসতে পারে। নিচে আমরা বিস্তারিত কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করছি।
১. ত্বকের অতিরিক্ত শুষ্কতা বা ড্রাইন্যাস
আমাদের হাতের তালুর তুলনায় নখের চারপাশের চামড়া অনেক বেশি পাতলা। শীতকালে যখন বাতাসে আর্দ্রতা কমে যায়, তখন ত্বক দ্রুত শুকিয়ে যায়। শুষ্ক ত্বক ফেটে গিয়ে চামড়া উঠতে থাকে।
আপনি যদি নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার না করেন, তবে এই সমস্যা বেশি হয়। বিশেষ করে যাদের ত্বক জন্মগতভাবে শুষ্ক, তারা এই সমস্যায় বেশি ভোগেন। বারবার হাত ধোয়া এবং লোশন না লাগানো এর অন্যতম বড় কারণ।
২. বারবার হাত ধোয়ার অভ্যাস
পরিষ্কার থাকা ভালো, কিন্তু অতিরিক্ত হাত ধোয়া ত্বকের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। আপনি যদি বারবার সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধুয়ে থাকেন, তবে ত্বকের প্রাকৃতিক তেল ধুয়ে যায়।
সাবানে থাকা ক্ষার ত্বকের সুরক্ষা স্তর নষ্ট করে দেয়। ফলে নখের চারপাশের চামড়া আলগা হয়ে উঠে আসে। বিশেষ করে গরম পানি ব্যবহার করলে এই সমস্যা আরও বেড়ে যায়। তাই হাত ধোয়ার পর হাত শুকিয়ে ময়েশ্চারাইজার লাগানো খুব জরুরি।
৩. ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার
আমরা প্রতিদিন নানা ধরনের রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসি। যেমন- ডিশওয়াশিং লিকুইড, কাপড় ধোয়ার ডিটারজেন্ট বা ঘর পরিষ্কার করার ফ্লোর ক্লিনার। এই জিনিসগুলোতে খুব কড়া কেমিক্যাল থাকে।
এসব কেমিক্যাল সরাসরি হাতে লাগলে চামড়া পুড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। নখের চারপাশের নরম চামড়া এসব সহ্য করতে পারে না। ফলে চামড়া উঠতে শুরু করে। আপনি যদি গ্লাভস না পরে এসব কাজ করেন, তবে আপনার হাতের চামড়া নষ্ট হওয়াটাই স্বাভাবিক।
৪. পুষ্টির অভাব ও ভিটামিনের ঘাটতি
আপনার শরীরের ভেতরটা যদি সুস্থ না থাকে, তবে তার প্রভাব ত্বকে পড়বেই। হাতের নখের চারপাশে চামড়া উঠার কারণ হিসেবে ভিটামিনের অভাবকে দায়ী করা হয়। বিশেষ করে ভিটামিন বি-৩, বি-৭ (বায়োটিন) এবং ভিটামিন সি-এর অভাব হলে এমন হয়।
ভিটামিন বি ত্বককে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে ভিটামিন সি কোলাজেন তৈরি করে ত্বককে নমনীয় রাখে। শরীরে ক্যালসিয়ামের অভাব হলেও নখের স্বাস্থ্য খারাপ হয় এবং চামড়া ওঠে। তাই আপনার ডায়েটে পুষ্টির দিকে নজর দেওয়া উচিত।
৫. নখ কামড়ানোর বদভ্যাস
অনেকেরই টেনশন হলে বা অবসরে নখ কামড়ানোর অভ্যাস থাকে। এটি একটি খুব খারাপ অভ্যাস। দাঁত দিয়ে নখ কামড়ানোর সময় নখের চারপাশের চামড়াতেও আঘাত লাগে।
লালার মধ্যে থাকা এনজাইম ত্বকের ক্ষতি করে। এছাড়া দাঁতের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া সরাসরি চামড়ার ভেতরে ঢুকে যায়। এতে নখের পাশে ইনফেকশন হতে পারে এবং চামড়া উঠে গিয়ে ক্ষত তৈরি হয়। এই অভ্যাসটি আপনার হাতের সৌন্দর্য নষ্ট করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যেরও ক্ষতি করে।
৬. নখের ভুল যত্ন বা ম্যানিকিউর
আমরা সুন্দর দেখানোর জন্য ম্যানিকিউর করি। কিন্তু ভুলভাবে ম্যানিকিউর করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। নখের পাশের চামড়া (কিউটিকল) খুব জোরে কাটা বা ঘষা হলে চামড়া উঠে যায়।
অনেক সময় পার্লারে ব্যবহৃত সস্তা নেলপলিশ বা রিমুভার ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি করে। নেইলপলিশ রিমুভারে থাকা অ্যাসিটোন ত্বককে একদম শুষ্ক করে ফেলে। এর ফলে নখের চারপাশ ফেটে চামড়া উঠে আসে।
৭. আবহাওয়ার পরিবর্তন
আবহাওয়ার পরিবর্তন আমাদের ত্বকের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। শীতকালে বাতাস শুষ্ক থাকে, যা আমাদের হাত থেকে আর্দ্রতা কেড়ে নেয়। আবার প্রচণ্ড গরমে বা রোদে বেশিক্ষণ থাকলে ত্বক পুড়ে গিয়ে চামড়া উঠতে পারে।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে (AC) বেশিক্ষণ থাকলেও ত্বক শুকিয়ে যায়। এই যে ঘন ঘন তাপমাত্রার পরিবর্তন, এটি নখের চারপাশের চামড়া সহ্য করতে পারে না। তাই সব ঋতুতেই হাতের আলাদা যত্নের প্রয়োজন হয়।
৮. চর্মরোগ বা অ্যালার্জি
কখনো কখনো চামড়া ওঠা কোনো রোগের লক্ষণ হতে পারে। যেমন- একজিমা বা সোরিয়াসিস। এসব রোগে ত্বক লাল হয়ে যায়, চুলকায় এবং চামড়া উঠে আসে।
আবার অনেক সময় নির্দিষ্ট কোনো জিনিসের প্রতি অ্যালার্জি থাকলেও এমন হতে পারে। যেমন- নিকেল জাতীয় গয়না, সাবান বা কোনো নির্দিষ্ট খাবার। যদি চামড়া ওঠার সাথে সাথে চুলকানি বা র্যাশ থাকে, তবে বুঝতে হবে এটি কোনো অ্যালার্জির সমস্যা।
৯. সানবার্ন বা রোদে পোড়া
আমরা মুখের জন্য সানস্ক্রিন ব্যবহার করলেও হাতের কথা ভুলে যাই। দীর্ঘ সময় রোদে থাকলে হাতের চামড়া পুড়ে যায়। সূর্যরশ্মি ত্বকের কোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
কয়েক দিন পর সেই ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলো মরা চামড়া হিসেবে উঠে আসে। নখের চারপাশ যেহেতু পাতলা, তাই সেখান থেকেই চামড়া ওঠা শুরু হয়। তাই বাইরে বের হলে হাতেও সানস্ক্রিন লাগানো বুদ্ধিমানের কাজ।
১০. শরীরে পানির অভাব বা ডিহাইড্রেশন
আপনি যদি পর্যাপ্ত পানি না পান করেন, তবে আপনার ত্বক ভেতর থেকে শুকিয়ে যাবে। ডিহাইড্রেশন হলে ত্বক তার নমনীয়তা হারায়। এর ফলে নখের চারপাশসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গার চামড়া ফেটে যায়।
প্রতিদিন অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করা উচিত। পানি আপনার শরীরের টক্সিন বের করে দেয় এবং ত্বকে প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা আনে। ত্বক হাইড্রেটেড থাকলে চামড়া ওঠার সমস্যা অনেক কমে যায়।
১১. নখের চারপাশের ইনফেকশন বা প্যারোনিকিয়া
অনেক সময় ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাসের কারণে নখের চারপাশে ইনফেকশন হয়। একে চিকিৎসা বিজ্ঞানে 'প্যারোনিকিয়া' বলা হয়। এতে নখের চারপাশ লাল হয়ে ফুলে যায় এবং চামড়া উঠতে থাকে।
কখনো কখনো নখের কোণে পুঁজও জমতে পারে। যারা বেশিক্ষণ পানিতে কাজ করেন, তাদের এই সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। এই অবস্থায় অবহেলা না করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
প্রতিকার ও ঘরোয়া সমাধান
হাতের নখের চারপাশে চামড়া উঠার কারণ যাই হোক না কেন, কিছু সহজ উপায়ে আপনি এটি দূর করতে পারেন। নিচে কিছু কার্যকর টিপস দেওয়া হলো:
- ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার: প্রতিবার হাত ধোয়ার পর ভালো মানের হ্যান্ড ক্রিম বা লোশন লাগান।
- অলিভ অয়েল মাসাজ: রাতে ঘুমানোর আগে নখের চারপাশে অলিভ অয়েল বা নারকেল তেল দিয়ে হালকা মাসাজ করুন। এটি ত্বককে নরম রাখবে।
- মধু ও লেবু: মধু প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার হিসেবে কাজ করে। মধুর সাথে সামান্য লেবুর রস মিশিয়ে নখের পাশে লাগিয়ে রাখুন ১৫ মিনিট। এরপর ধুয়ে ফেলুন।
- গ্লাভস ব্যবহার: থালাবাসন মাজা বা কাপড় ধোয়ার সময় অবশ্যই রাবারের গ্লাভস পরবেন।
- পর্যাপ্ত পানি ও সুষম খাবার: প্রচুর পানি পান করুন এবং রঙিন শাকসবজি ও ফলমূল খান।
- অ্যালোভেরা জেল: ফ্রেশ অ্যালোভেরা জেল নখের চারপাশে লাগালে জ্বালাপোড়া কমে এবং ত্বক দ্রুত সেরে ওঠে।
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?
সাধারণত চামড়া ওঠা ঘরোয়া যত্নেই ভালো হয়ে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি: ১. যদি নখের চারপাশ অনেক বেশি ফুলে যায় এবং প্রচণ্ড ব্যথা হয়। ২. যদি নখের কোণ দিয়ে পুঁজ বের হয়। ৩. যদি চামড়া ওঠা সারা হাতে ছড়িয়ে পড়ে। ৪. যদি ঘরোয়া প্রতিকারেও কোনো কাজ না হয়।
উপসংহার
হাতের নখের চারপাশে চামড়া উঠার কারণ মূলত অযত্ন এবং শুষ্কতা। আমাদের হাতের ত্বক আমাদের স্বাস্থ্যের আয়না। তাই হাতকে অবহেলা করবেন না। প্রতিদিন সামান্য একটু সময় দিলেই আপনি পেতে পারেন সুন্দর ও নরম হাত। প্রচুর পানি পান করুন, পুষ্টিকর খাবার খান এবং নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন। মনে রাখবেন, সচেতনতাই সুস্থ থাকার চাবিকাঠি।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. নখের চামড়া উঠলে কি টেনে তোলা উচিত?
না, ভুলেও নখের চামড়া টেনে তুলবেন না। এতে ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে এবং ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রয়োজনে ছোট কাঁচি দিয়ে সাবধানে বাড়তি অংশটুকু কেটে ফেলুন।
২. কোন ভিটামিনের অভাবে নখের চামড়া ওঠে?
মূলত ভিটামিন বি কমপ্লেক্স (বিশেষ করে বি-৩ এবং বি-৭) এবং ভিটামিন সি-এর অভাবে নখের চারপাশের চামড়া উঠতে পারে।
৩. শীতকালে কেন বেশি চামড়া ওঠে?
শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতা খুব কম থাকে। বাতাস আমাদের ত্বকের প্রাকৃতিক তেল শুষে নেয়। ফলে ত্বক শুষ্ক হয়ে নখের চারপাশ থেকে চামড়া ওঠে।
৪. ঘরোয়াভাবে কীভাবে এটি দ্রুত সারানো যায়?
রাতে ঘুমানোর আগে ভ্যাসলিন বা গ্লিসারিন ব্যবহার করলে সবচেয়ে দ্রুত ফলাফল পাওয়া যায়। এছাড়া কুসুম গরম পানিতে হাত ডুবিয়ে রেখে তারপর তেল মাসাজ করলেও উপকার মেলে।
৫. নখ কামড়ানোর অভ্যাস কীভাবে চামড়া ওঠার সাথে যুক্ত?
নখ কামড়ালে লালার সংস্পর্শে এসে চামড়া নরম ও দুর্বল হয়ে যায়। এছাড়া দাঁতের ঘর্ষণে চামড়া ছিঁড়ে যায়, যা পরে ইনফেকশনের রূপ নেয়।