গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে করণীয়?
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা। এটি মা ও অনাগত শিশু উভয়ের জন্যই ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তবে সঠিক নিয়ম মেনে চললে সুস্থ সন্তান জন্ম দেওয়া সম্ভব।
নিচে আপনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ এবং এসইও-অপ্টিমাইজড আর্টিকেল দেওয়া হলো।
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে করণীয়: মা ও শিশুর সুরক্ষায় পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন
গর্ভাবস্থায় একজন নারীর শরীরে অনেক ধরনের পরিবর্তন আসে। এর মধ্যে একটি অন্যতম স্বাস্থ্যঝুঁকি হলো রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়া। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় জেসটেশনাল ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes) বলা হয়। অনেক মা এই বিষয়টি নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় থাকেন।
কিন্তু ভয়ের কিছু নেই। সঠিক জীবনযাপন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে করণীয় সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে আপনি এবং আপনার সন্তান উভয়েই সুস্থ থাকবেন।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করব গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস কেন হয়, এর লক্ষণ কী এবং এটি নিয়ন্ত্রণে রাখার ১২টি কার্যকরী উপায় সম্পর্কে।
একনজরে মূল কথা: গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে আতঙ্কিত হবেন না। খাদ্যভ্যাস পরিবর্তন, নিয়মিত হাঁটাচলা এবং ব্লাড সুগার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে অবহেলা করলে মা ও শিশু উভয়েরই দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হতে পারে।
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস বা জেসটেশনাল ডায়াবেটিস কী?
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস বা জেসটেশনাল ডায়াবেটিস হলো এমন একটি অবস্থা যখন একজন নারীর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। মজার ব্যাপার হলো, গর্ভাবস্থার আগে হয়তো ওই নারীর ডায়াবেটিস ছিল না।
সাধারণত গর্ভাবস্থার ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহের মধ্যে এটি ধরা পড়ে। আমাদের শরীরে ইনসুলিন নামক একটি হরমোন থাকে। এটি রক্তে থাকা শর্করা বা চিনিকে শক্তিতে রূপান্তর করে।
গর্ভাবস্থায় প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল থেকে কিছু হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোনগুলো ইনসুলিনের কাজে বাধা দেয়। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে সন্তান প্রসবের পর এই ডায়াবেটিস চলে যায়। তবে গর্ভাবস্থায় এটি নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। এটি অবহেলা করলে মা ও শিশু উভয়েরই জটিলতা বাড়তে পারে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এটি টাইপ-১ বা টাইপ-২ ডায়াবেটিস থেকে আলাদা। এটি সাময়িক, তবে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে।
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস কেন হয়? ঝুঁকির কারণসমূহ
গর্ভাবস্থায় কেন কারো ডায়াবেটিস হয়, তার সুনির্দিষ্ট কারণ সব সময় জানা যায় না। তবে কিছু বিষয় বা রিস্ক ফ্যাক্টর থাকলে এই ঝুঁকি বেড়ে যায়।
যাদের ওজন বেশি, তাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ওজন ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। এছাড়া পরিবারের কারো ডায়াবেটিস থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।
প্রধান ঝুঁকির কারণসমূহ:
- অতিরিক্ত ওজন: বিএমআই (BMI) ৩০ বা তার বেশি হলে।
- পারিবারিক ইতিহাস: বাবা-মা বা ভাই-বোনের ডায়াবেটিস থাকলে।
- বয়স: গর্ভবতী মায়ের বয়স ২৫ বা ৩৫ বছরের বেশি হলে।
- পূর্ববর্তী ইতিহাস: আগের গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস থাকলে।
- বড় শিশু: আগের সন্তানের ওজন ৪ কেজির বেশি হলে।
তাছাড়া পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS) থাকলেও ঝুঁকি থাকে। এশীয় নারীদের মধ্যে এই প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। তাই গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে করণীয় সম্পর্কে আগে থেকেই জানা উচিত।
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে লক্ষণসমূহ
জেসটেশনাল ডায়াবেটিসের সবচেয়ে ভয়ের দিক হলো, অনেক সময় এর কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। নিয়মিত চেকআপের মাধ্যমেই এটি ধরা পড়ে।
তবে রক্তে শর্করার মাত্রা খুব বেশি বেড়ে গেলে কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এই লক্ষণগুলো সাধারণ গর্ভাবস্থার লক্ষণের মতোই মনে হতে পারে। তাই অনেকে একে গুরুত্ব দেন না।
সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:
- অতিরিক্ত পিপাসা: বারবার পানি পিপাসা পাওয়া।
- ঘন ঘন প্রস্রাব: স্বাভাবিকের চেয়ে বেশিবার টয়লেটে যাওয়া।
- ক্লান্তি: সারাক্ষণ শরীর দুর্বল ও ক্লান্ত লাগা।
- মুখ শুকিয়ে যাওয়া: পর্যাপ্ত পানি পানের পরও মুখ শুকিয়ে থাকা।
কখনও কখনও দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যেতে পারে। যৌনাঙ্গে বারবার ইনফেকশন বা চুলকানি হতে পারে। এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস নির্ণয় ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস নিশ্চিত করার জন্য রক্ত পরীক্ষা করা জরুরি। সাধারণত গর্ভাবস্থার ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহের মধ্যে এই পরীক্ষা করা হয়। একে বলা হয় ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (OGTT)।
যাদের ঝুঁকি বেশি, তাদের গর্ভাবস্থার শুরুতেই এই পরীক্ষা করানো হতে পারে। পরীক্ষার পদ্ধতিটি বেশ সহজ। প্রথমে খালি পেটে রক্ত নেওয়া হয়। এরপর গ্লুকোজের শরবত খাওয়ানো হয়।
পরীক্ষার ধাপসমূহ:
- ফাস্টিং সুগার: সকালে নাস্তা না করে রক্ত দেওয়া।
- গ্লুকোজ পান: ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ পানিতে মিশিয়ে পান করা।
- ২ ঘণ্টা পর: গ্লুকোজ খাওয়ার ২ ঘণ্টা পর আবার রক্ত পরীক্ষা।
যদি খালি পেটে সুগার ৫.১ mmol/L এর বেশি হয়, তবে ডায়াবেটিস আছে বলে ধরা হয়। আবার গ্লুকোজ খাওয়ার ২ ঘণ্টা পর যদি ৮.৫ mmol/L এর বেশি হয়, তবে সেটিও ডায়াবেটিস।
রিপোর্ট পজিটিভ আসলে ভয় পাবেন না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে করণীয় পদক্ষেপগুলো শুরু করতে হবে।
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে করণীয়: সঠিক খাদ্যতালিকা
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রধান হাতিয়ার হলো সঠিক খাবার নির্বাচন। গর্ভাবস্থায় ডায়েট করা মানে না খেয়ে থাকা নয়। বরং সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করা।
শর্করা জাতীয় খাবার বা কার্বোহাইড্রেট কম খেতে হবে। ভাত, রুটি, আলু রক্তে সুগার বাড়িয়ে দেয়। এর বদলে লাল চালের ভাত বা লাল আটার রুটি খাওয়া ভালো। এগুলো ধীরে ধীরে হজম হয়।
খাদ্যতালিকার টিপস:
- ছোট ছোট মিল: একবারে বেশি না খেয়ে সারা দিনে ৫-৬ বার অল্প করে খান।
- প্রোটিন: মাছ, মাংস, ডিম, ডাল বেশি করে খান।
- সবজি: প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাকসবজি খেতে হবে।
- চিনি বর্জন: মিষ্টি, কেক, পেস্ট্রি, কোমল পানীয় পুরোপুরি বাদ দিন।
| খাবার | কী খাবেন (হ্যাঁ) | কী খাবেন না (না) |
|---|---|---|
| শর্করা | লাল চাল, ওটস, লাল আটা | সাদা চাল, ময়দা, বিস্কুট |
| ফল | আপেল, পেয়ারা, নাশপাতি | আম, কাঁঠাল, লিচু, খেজুর |
| পানীয় | পানি, ডাবের পানি (পরিমিত) | কোক, জুস, চিনিযুক্ত চা |
মনে রাখবেন, বাচ্চার বৃদ্ধির জন্য পুষ্টি দরকার। তাই একজন পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে খাদ্যতালিকা তৈরি করা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
গর্ভাবস্থায় নিরাপদ ব্যায়াম ও শরীরচর্চা
অনেকে মনে করেন গর্ভাবস্থায় শুয়ে-বসে থাকাই ভালো। কিন্তু ডায়াবেটিস থাকলে হালকা ব্যায়াম করা অত্যন্ত জরুরি। ব্যায়াম ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়।
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা উচিত। সকালে বা বিকেলে হাঁটার অভ্যাস করুন। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া এটি কোমর ব্যথা কমাতেও সহায়ক।
নিরাপদ ব্যায়ামগুলো:
- হাঁটা: সবচেয়ে নিরাপদ ও সহজ ব্যায়াম।
- সাঁতার: শরীর ঠান্ডা রাখে এবং জয়েন্টে চাপ কম পড়ে।
- গর্ভাবস্থার যোগব্যায়াম: বিশেষ কিছু ইয়োগা বা স্ট্রেচিং।
তবে কোনো ব্যায়াম শুরু করার আগে অবশ্যই ডাক্তারের অনুমতি নিন। যদি শ্বাসকষ্ট হয় বা পেটে ব্যথা লাগে, তবে সাথে সাথে ব্যায়াম বন্ধ করুন। খুব ভারী কাজ বা দৌড়ঝাঁপ করা যাবে না।
ব্লাড সুগার মনিটরিং বা নিয়মিত পরীক্ষা
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে করণীয় কাজের মধ্যে অন্যতম হলো নিয়মিত সুগার মাপা। বাসায় একটি গ্লুকোমিটার রাখা খুব জরুরি।
প্রতিদিন বা সপ্তাহে কতবার মাপতে হবে, তা ডাক্তার বলে দেবেন। সাধারণত সকালে খালি পেটে এবং প্রধান খাবারের ২ ঘণ্টা পর মাপতে হয়। একটি ডায়েরিতে এই রিডিংগুলো লিখে রাখবেন।
টার্গেট ব্লাড সুগার লেভেল:
- খালি পেটে: ৫.৩ mmol/L এর নিচে।
- খাওয়ার ১ ঘণ্টা পর: ৭.৮ mmol/L এর নিচে।
- খাওয়ার ২ ঘণ্টা পর: ৬.৭ mmol/L এর নিচে।
যদি দেখেন ডায়েট ও ব্যায়ামের পরও সুগার কমছে না, তবে দ্রুত ডাক্তারকে জানান। নিয়মিত মনিটরিং আপনাকে বুঝতে সাহায্য করবে কোন খাবারটি আপনার সুগার বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ইনসুলিন ও ওষুধের সঠিক ব্যবহার
অনেকের ধারণা, গর্ভাবস্থায় ওষুধ বা ইনসুলিন নিলে বাচ্চার ক্ষতি হয়। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বরং অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বাচ্চার বেশি ক্ষতি করে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডায়েট ও ব্যায়ামেই কাজ হয়। কিন্তু ১০-২০ শতাংশ মায়ের ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে। মেটফরমিন (Metformin) ট্যাবলেট অনেক সময় দেওয়া হয়। এটি নিরাপদ।
যদি ট্যাবলেটে কাজ না হয়, তবে ইনসুলিন নিতে হবে। ইনসুলিন প্লাসেন্টা ভেদ করে বাচ্চার শরীরে প্রবেশ করতে পারে না। তাই এটি বাচ্চার জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ।
সতর্কতা: ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাবেন না বা বন্ধ করবেন না। ইনসুলিন নেওয়ার সঠিক নিয়ম জেনে নিন। পেটে ইনসুলিন নিলে বাচ্চার কোনো ক্ষতি হয় না।
মা ও শিশুর ওপর ডায়াবেটিসের ক্ষতিকর প্রভাব
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মা ও শিশু উভয়েরই জটিলতা হতে পারে। তাই এই বিষয়গুলো জানা থাকা দরকার। ভয়ের জন্য নয়, সতর্কতার জন্য।
শিশুর ওপর প্রভাব:
- ম্যাক্রোসোমিয়া: বাচ্চার আকার ও ওজন অনেক বেড়ে যেতে পারে (৪ কেজির বেশি)।
- হাইপোগ্লাইসেমিয়া: জন্মের পর বাচ্চার সুগার লেভেল হঠাৎ কমে যেতে পারে।
- জন্ডিস: জন্মের পর বাচ্চার জন্ডিস হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- শ্বাসকষ্ট: বাচ্চার ফুসফুস পরিপক্ক হতে দেরি হতে পারে।
মায়ের ওপর প্রভাব:
- প্রি-এক্লাম্পসিয়া: উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
- সিজারিয়ান ডেলিভারি: বাচ্চা বড় হলে নরমাল ডেলিভারি কঠিন হয়ে যায়।
- ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস: পরবর্তী জীবনে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
সঠিক সময়ে গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে করণীয় পদক্ষেপ নিলে এই ঝুঁকিগুলো প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব।
প্রসবকালীন সতর্কতা ও প্রস্তুতি
যাদের জেসটেশনাল ডায়াবেটিস আছে, তাদের প্রসবের সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। সাধারণত ৩৭ থেকে ৪০ সপ্তাহের মধ্যে ডেলিভারি করানো হয়।
বাচ্চার ওজন বেশি হলে ডাক্তার সিজারিয়ান সেকশনের পরামর্শ দিতে পারেন। তবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকলে এবং বাচ্চার ওজন স্বাভাবিক থাকলে নরমাল ডেলিভারি সম্ভব।
প্রস্তুতির ধাপ:
- হাসপাতাল নির্বাচন: এমন হাসপাতাল বাছুন যেখানে মা ও নবজাতকের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা (NICU) আছে।
- ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ: প্রসবের সময় মায়ের সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব জরুরি।
- ডাক্তারের সাথে আলোচনা: প্রসবের পরিকল্পনা আগে থেকেই করে রাখুন।
লেবার পেইন বা প্রসব বেদনা ওঠার পর ঘন ঘন সুগার চেক করা হয়। প্রয়োজনে গ্লুকোজ বা ইনসুলিন স্যালাইন দেওয়া হতে পারে।
প্রসব পরবর্তী যত্ন ও ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনা
সন্তান প্রসবের সাথে সাথেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রসবের পর প্লাসেন্টা বেরিয়ে যাওয়ার ফলে সাধারণত ডায়াবেটিস সেরে যায়। তবে কিছু নিয়ম মানতে হয়।
প্রসবের ৬ থেকে ১২ সপ্তাহ পর আবার ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (OGTT) করতে হবে। এটি নিশ্চিত করবে যে আপনার ডায়াবেটিস পুরোপুরি চলে গেছে কিনা।
বুকের দুধ খাওয়ানো: শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো মায়ের জন্য খুব উপকারী। এটি মায়ের ক্যালরি বার্ন করতে সাহায্য করে। ফলে ওজন কমে এবং ভবিষ্যতে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে। এছাড়া এটি শিশুর জন্যও সুগার নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
যাদের একবার জেসটেশনাল ডায়াবেটিস হয়েছে, তাদের ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি ৫০% বেশি থাকে। তাই সারা জীবন স্বাস্থ্যকর খাবার ও ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়া উচিত।
মানসিক স্বাস্থ্য ও দুশ্চিন্তা কমানোর উপায়
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ধরা পড়লে মায়েরা খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। "আমার বাচ্চার কি ক্ষতি হবে?" - এই চিন্তা সারাক্ষণ মাথায় ঘোরে।
মনে রাখবেন, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা স্ট্রেস রক্তে সুগারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল ইনসুলিনের কাজে বাধা দেয়। তাই মন ভালো রাখা চিকিৎসারই একটি অংশ।
মানসিক প্রশান্তির উপায়:
- পর্যাপ্ত ঘুম: রাতে অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন।
- পরিবারের সহায়তা: স্বামীর বা পরিবারের সদস্যদের সাথে নিজের অনুভূতির কথা শেয়ার করুন।
- ইতিবাচক চিন্তা: মনে রাখবেন, হাজার হাজার মা এই সমস্যা নিয়ে সুস্থ সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন।
প্রয়োজনে মেডিটেশন বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করতে পারেন। নিজেকে সময় দিন। আপনার মানসিক সুস্থতা বাচ্চার বিকাশে সাহায্য করবে।
উপসংহার
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস একটি চ্যালেঞ্জ, কিন্তু এটি কোনো অভিশাপ নয়। সঠিক সচেতনতা এবং নিয়ম মেনে চলার মাধ্যমে আপনি এই চ্যালেঞ্জ জয় করতে পারেন।
"গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে করণীয়" বিষয়গুলো মেনে চললে আপনার গর্ভাবস্থা হবে নিরাপদ এবং আনন্দদায়ক। নিয়মিত চেকআপ করান, সুষম খাবার খান এবং হাসিখুশি থাকুন। আপনার একটু সচেতনতাই পারে আপনার অনাগত সন্তানকে পৃথিবীর আলোয় সুস্থভাবে নিয়ে আসতে।
আজই আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলুন এবং একটি সুন্দর রুটিন তৈরি করে নিন। সুস্থ মা মানেই সুস্থ সন্তান।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে কি ফল খাওয়া যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ, ফল খাওয়া যাবে, তবে পরিমিত পরিমাণে। কম মিষ্টি ফল যেমন পেয়ারা, আপেল, নাশপাতি, কমলা বা জাম্বুরা খাওয়া নিরাপদ। পাকা আম, কাঁঠাল, লিচু বা খেজুর এড়িয়ে চলাই ভালো কারণ এগুলোতে সুগারের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। ফলের জুস না খেয়ে আস্ত ফল চিবিয়ে খাওয়া ভালো।
২. জেসটেশনাল ডায়াবেটিস কি প্রসবের পর সেরে যায়?
উত্তর: অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রসবের পরপরই এটি সেরে যায়। কারণ গর্ভাবস্থায় যে হরমোনের কারণে ডায়াবেটিস হয়েছিল, প্রসবের পর সেই হরমোনের প্রভাব কমে যায়। তবে প্রসবের ৬ সপ্তাহ পর অবশ্যই পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে যে সুগার লেভেল স্বাভাবিক হয়েছে কিনা।
৩. গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে কি সিজার করতেই হবে?
উত্তর: না, সব সময় সিজার বা সি-সেকশন বাধ্যতামূলক নয়। যদি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং বাচ্চার ওজন স্বাভাবিক থাকে, তবে নরমাল ডেলিভারি সম্ভব। তবে বাচ্চার ওজন যদি ৪ কেজির বেশি হয় বা মায়ের অন্য কোনো জটিলতা থাকে, তখন ডাক্তার সিজারের পরামর্শ দিতে পারেন।
৪. ইনসুলিন নিলে কি বাচ্চার কোনো ক্ষতি হয়?
উত্তর: না, ইনসুলিন বাচ্চার কোনো ক্ষতি করে না। ইনসুলিন একটি বড় অণু যা প্লাসেন্টা ভেদ করে বাচ্চার শরীরে প্রবেশ করতে পারে না। বরং অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বাচ্চার জন্য বেশি ক্ষতিকর। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ইনসুলিন নেওয়া গর্ভাবস্থায় সবচেয়ে নিরাপদ চিকিৎসা পদ্ধতি।
৫. গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস থাকলে কি রোজা রাখা যাবে?
উত্তর: গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস থাকলে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা বা রোজা রাখা মা ও শিশু উভয়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। দীর্ঘ সময় না খেলে সুগার লেভেল খুব কমে যেতে পারে (হাইপোগ্লাইসেমিয়া), যা বাচ্চার জন্য বিপদজনক। এই বিষয়ে অবশ্যই আপনার গাইনোকোলজিস্ট এবং ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।